গল্প: না ফেরার দেশে নীতা

এস এম হৃদয় রহমান:

নীতার দিনগুলো অন্যরকম কাটছিল। উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন বুনেছে মনে মনে। কিন্তু পথে অনেক বাঁধা। প্রায় প্রতিদিনই নীতাকে নানারকম জাগতিক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। নীতার সময়টা খুব ভাল যাচ্ছে না। কিশোরী নীতার পড়ালেখা সবে মাত্র দশম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত। ভ্যানচালক পিতা আক্কাসের স্বপ্ন মেয়েকে বিয়ে দিয়ে নিজের দায়িত্বটুকু পালন করা।

মেয়ের স্বপ্ন আর পিতার স্বপ্নের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য। এত পার্থক্য যে দুজনের যে কোন একজনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য অন্য আরেকজনের মতের পার্থক্য দেখা দিবে সেটা স্বাভাবিক। নীতার এই জীবন যন্ত্রণাময় সময়ের অপেক্ষায়। গ্রামের মাধ্যমিক স্কুলে যাওয়ার কাঁচা-পাকা সড়কটি নীতাকে যতটুকু না ভোগান্তিতে ফেলে তার চেয়ে বেশি সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি করে গ্রামের কিছু বখাটে ছেলে প্রতিনিয়ত দুঃব্যবহার। মাঝে মাঝে মনটা ছোট হয়ে যায় কিছু অশ্লীল কটুক্তির কারণে। অনেকদিন নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছিল নীতা। বাবার কথা চিন্তা করে নিজেকে শেষ করে দেয়ার চিন্তা থেকে অনেকটাই সরে আসে সে, মা যে তার গত হয়েছে অনেক আগেই। বখাটেদের উৎপাত কমছে না। জীবনটা দুর্বিষহ অবস্থায় কাটছে নীতার পিতা আক্কাসের কানে একদিন খবর এল তার মেয়েকে কে বা কারা উত্যক্ত করছে। এগুলো জেনেও পিতা আক্কাস কিছু করতে পারছে না। কারণ গ্রামের যে বখাটে ছেলেগুলো মেয়েটাকে উত্যক্ত করে তারা সবাই এলাকার খুব প্রভাবশালী। আওরঙ্গপুর গ্রামের প্রভাবশালী মানুষদের সন্তান এরা। তাদের সঙ্গে পেরে ওঠা আক্কাসের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মেয়েও অনেক বড় হয়েছে, মেধাবী হলেও তার পক্ষে মেয়ের উচ্চ শিক্ষার পড়ালেখার খরচ চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব। নীতার জীবন থেকে হয়তো পড়ালেখা বলে শব্দটি অনেক দূর চলে যাবে। শেষ লড়াইয়ে তার টিকে থাকাটা প্রচন্ড মুশকিলের বিষয়। গ্রামে বলাবলি হচ্ছে নীতার জন্য পাত্র দেখা হচ্ছে। ভাল পাত্র পেলে হয়ত নীতার বিয়ে সে পাত্রের সঙ্গে দেয়া হবে। নীতাদের অর্থনৈতিক সঙ্গতি নেই। আর এ অর্থনৈতিক সঙ্গতি না থাকার কারণে নীতার জীবন দুর্বিষহ যন্ত্রণার একটা সময় চলছে এবং আরেকটি যন্ত্রণার সময় অপেক্ষা করছে! এসএসসি পরীক্ষা চলে এল এরই মধ্যে। সংগ্রাম করে, লড়াই করে এস এস সি পরীক্ষার সময়টা পার করল নীতা। পরীক্ষা শেষে তার চিন্তা সে আরও পড়ালেখা করবে কিন্তু তার বাবার চিন্তা নীতাকে বিয়ে দিতে হবে।

শেষ পর্যন্ত নীতার বিয়ে ঠিক হলো তারা চেয়ে অর্ধেক বয়সে বড় একজনের সঙ্গে। নীতার শিক্ষা জীবনের সমাপ্তির বড় একটা সময় চলে এল। সব স্বপ্ন চুরমার হওয়ার একটা সময় চলে এল। স্বপ্ন চুরমার হলো বিয়ে পিড়িতে বসে। নীতার বিয়ের প্রথম দিনেই সে জানতে পারল তার স্বামী এর আগেও একধিক বিয়ে করেছিল। নীতা তার স্বামীর তৃতীয় স্ত্রী। এর আগে দুই বউকে নির্যাতন করে মেরেছে তার স্বামী। এ বিষয়গুলো নীতার বাবা জানত কিন্তু মেয়ের বিয়েতে যৌতুক দিতে হবে না, পাত্রের অঢেল টাকা আছে তা ভেবে এ আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত তার বাবার। কন্যা দায়গ্রস্ততা থেকে মুক্তির পথ খুঁজে নেয়া।

নীতার দিনগুলো খুব কষ্টে কাটছে। বিয়ের পর একটি দিনও স্বামীর ঘরে ভাল সময় কাটেনি। যন্ত্রণায় যন্ত্রণায় দিন যাচ্ছে তার। মাঝে মাঝে বললে ভুল হবে, প্রায় প্রতিদিনই স্বামীর হাতে লাঠির আঘাত খেতে হয় তার। নীতার সারা শরীর জুড়ে যেন শুধুই নির্যাতনের চিহ্ন। পান থেকে চুন খসলেই স্বামীর অত্যাচারের শিকার হতে হয়। মাঝে মাঝে আধমরা হয়ে থাকতে দেখা যায় দরিদ্র পিতার এ সন্তানকে। স্বামীর ঘর থেকে চলে আসারও কোন পথ পাচ্ছে না নীতা। জীবন এমনই দুর্বিষহ অবস্থায় কাটছে। হঠাৎ একদিন নীতার বাবার কাছে খবর এর নীতা আর বেঁচে নেই। স্বামীর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে রাতের বেলায় শশুরবাড়ীর আমাবাগানে গলায় দড়ি দিয়েছে সে! নির্যাতনের অসহ্য যন্ত্রণায় নিজের জীবনকে বলি দান করল এক মেধাবী প্রাণ। মৃত্যুর দুদিন পর খবর এল নীতা যে এস এস সি পরীক্ষা দিয়েছিল সেই পরীক্ষায় নীতা সারা বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। নীতার রেজাল্ট গ্রামের স্কুল মাস্টারের কাছ থেকে জানার পর কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল তার বাবা। না ফেরার দেশে চলে যাওয়া নীতার এই ফলাফল যেন দরিদ্র পিতার জীবনকেও থামিয়ে দেয়ার উপক্রম হয়েছে।

 

শেয়ার করুন :