ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও উগ্রবাদ-মৌলবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন

আকাশছোঁয়া ডেস্ক : লালমনিরহাটের পাটগ্রামে একটি মসজিদে কথিত কোরান অবমাননার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গণপিটুনিতে হত্যা ও মৃতদেহ আগুনে পোড়ানোর নৃশংসতার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল(মার্কসবাদী)-র উদ্যোগে এক প্রতিবাদ সমাবেশ সম্প্রতি ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত হয়।

বাসদ(মার্কসবাদী) নেতা জহিরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ফখ্রুদ্দিন কবির আতিক, নাঈমা খালেদ মনিকা, সীমা দত্ত ও রাশেদ শাহরিয়ার প্রমুখ। প্রতিবাদ সমাবেশের পর একটি বিক্ষোভ মিছিল পল্টন এলাকায় রাজপথ প্রদক্ষিণ করে।

সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, “ধর্মের নামে মানুষ হত্যা সভ্য দুনিয়ায় কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। কেউ যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিদ্বেষ সৃষ্টি বা ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের লক্ষ্যে কোন ধর্মের প্রতি কটূক্তি বা অবমাননা করে, তার প্রতিবাদ-সমালোচনা-নিন্দা করার অধিকার সবার আছে। প্রয়োজনে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যায়। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগ ও অসদুদ্দেশ্য প্রমাণিত হলে বিচারের মাধ্যমে তার শাস্তি হতে পারে। কিন্তু, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে যথাযথ তদন্ত-বিচার ছাড়াই কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর খেয়াল-খুশিমত তাৎক্ষণিক শাস্তি বিধান সমর্থন করা যায় না। বিশেষ করে, ধর্মের নামে হত্যা-গণপিটুনি-আগুনে পোড়ানোর মত মধ্যযুগীয় বর্বরতা আধুনিক গণতান্ত্রিক দেশে কোনভাবেই চলতে পারে না। ফলে, পাটগ্রামে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় যথাযথ তদন্ত করে উস্কানিদাতা ও অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসাথে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে  জনগণকে সচেতন ও শিক্ষিত করতে হবে। মৌলবাদী গোষ্ঠী ও ধর্মের নামে হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টিকারীদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।”

বক্তারা আরো বলেন, “বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা-উগ্রবাদ ও হানাহানি বৃদ্ধির ফলাফলে এসব ঘটনা ঘটছে। গতকাল ফ্রান্সের নীস্ শহরে একটি গীর্জায় ঢুকে ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিয়ে ৩ জন নিরপরাধ মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যার নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। যেকোন ধর্মের নামে যারা নিরীহ মানুষকে হত্যা করে তারা মানবতার শত্রু ও ঘৃণ্য অপরাধী। একইসাথে, সাম্প্রতিককালে ফ্রান্সের মাখোঁ সরকারের মুসলিমবিদ্বেষী ভূমিকারও আমরা নিন্দা জনাই। কিছুদিন আগে ফ্রান্সে একজন স্কুলশিক্ষক ক্লাস নিতে গিয়ে ইসলামের নবীর ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শন করলে এক সন্ত্রাসী তাঁকে শিরচ্ছেদ করে হত্যা করে। এটি একজন ধর্মীয় উগ্রবাদীর অসহিষ্ণুতাজনিত প্রতিক্রিয়া ও অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ, কিন্তু তার জন্য ফ্রান্সের সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়কে দায়ী করা চলে না। অথচ, মাখোঁ সরকার এ’ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ফ্রান্সের সমস্ত সরকারী ভবনে উক্ত ব্যঙ্গচিত্র রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছে। এই পদক্ষেপ বিশ^ব্যাপী মুসলিমদের ধর্মীয় আবেগকে আহত করেছে এবং বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। যা ধর্মীয় মৌলবাদী ও উগ্রবাদী শক্তির হাতকেই শক্তিশালী করেছে। ফ্রান্স সরকার দেশের অভ্যন্তরে জনজীবনের সংকট থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে জনগণকে ধর্মীয় বিদ্বেষ ও হানাহানিতে লিপ্ত করার অসদুদ্দেশ্য থেকেই এই বিভাজনমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরা ফ্রান্স সরকারের এই উস্কানি ও তার প্রতিক্রিয়ায় সংঘটিত হত্যাকা- – উভয়েরই প্রতিবাদ জানাই।”

শেষে নেতৃবৃন্দ বলেন, “বাংলাদেশের বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার জন্য একদিকে ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তির সাথে আপোষ ও আঁতাত করছে, অন্যদিকে নিজেরাও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার করছে। এই সরকার রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক বিচার বহির্ভূত হত্যা-কে উৎসাহিত করছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিস্তারের পরিবর্তে তারা বলপ্রয়োগ ও জবরদস্তিমূলক এক ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেছে। তাদের গণবিরোধী শাসনে মানুষের জীবনে সংকট ও অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এই সবকিছুর ফলাফল ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও উগ্রবাদের বিস্তার। এই পরিস্থিতি পাল্টাতে চাই – জনজীবনের সংকট নিরসন ও গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ধর্ম-জাতি নির্বিশেষে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাকে শক্তিশালী করা। আমরা দেশের সকল শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ ও বাম-প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক দল, সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গকে সেই লক্ষ্যে নিজেদের উদ্যোগ বাড়ানোর আবেদন জানাচ্ছি।”

 

শেয়ার করুন :