মা

রুপা:

তুমি শুধুই ‘মা’। এই ‘মা’ খেতাব নিয়ে জন্মানোর অধিকার শুধু মা তোমারি। অধিকারের হাত ধরে আসে দায়িত্ব। এটা এমনই এক দায়িত্ব যা বহন করো তুমি হাসিমুখে সারাটাজীবন। সংসার, সন্তান, স্বামী সবইতো তোমার দায়িত্ব। দায়িত্ব শুধু তোমাকে দিতে শিখিয়েছে, বিনিময়ে কিছু আশা করার অধিকার দেইনি।

এই পৃথিবীর আলো দেখার আগে তোমার সাথেই আমার প্রথম পরিচয়। তোমার ভালো বাসার স্পর্শ, তোমার শরীরের মিষ্টি গন্ধ আমকে ছুঁয়ে গেছে যখন আমি ছোট্ট ভ্রণ, তিলে তিলে বড় হয়ে ওঠা মানব শিশু।

সেই শিশুটি জন্মানোর আগেই, প্রতিটি পদক্ষেপে তোমাকে শেখানো হয়েছে ভালো মা হতে হলে তোমার কথা আর নয়, তোমার সন্তানের জন্য তোমাকে ভাবতে হবে। আমার সুস্থতা, আমার ভালোভাবে বেড়ে ওঠাটাই তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।

তোমাকে শেখানো হয়েছিলো, ‘মা’ হবার মানে। ঘড়িতে ঘুরতে থাকা সেকেন্ড, ঘন্টার কাটা শুধুই তোমাকে স্মরন করিয়ে দিতো তোমার কি করতে হবে সন্তানের জন্য। নির্ঘুম রাত, ক্লান্ত দিন, দিনের পর দিন তবুও তুমি হাসি মুখে মেনে নিয়েছো সেই জীবন। হয়তো কেউ কেউ বলবে, ওটা কোন ত্যাগ স্বীকার করা নয় ওটা ‘মা’দের সহজাত দায়িত্ব।

আমাকে জন্ম দেবার সময়, তুমি অমানবিক কষ্টে চিৎকার করে করে, বার বার ফিরে আসা বেদনার বন্যা পাড়ি দিয়ে এবং জীবনের সর্বশেষ শক্তিবিন্দু একত্র করে আমাকে নিয়ে এলে এই পৃথিবীতে। তখন কেউ তোমার কষ্টের কথা জানতে তেমন আগ্রহী ছিল না। তারা সবাই অপেক্ষায় একটি ভীষণ কচি শিশু কণ্ঠের কান্ন শোনার আশায়।

আমি কাঁদলাম। সবাই আনন্দে মুখর হয়ে উঠেছিলো, আজানের ধ্বনি, মিষ্টান্নের ঢল নেমেছিলো চেনা ও অচেনা মানুষের জন্য। অথচ যে অসহায় অসহনীয় কষ্টের যুদ্ধ শেষে তুমি ‘মা’ আমাকে উপহার দিলে পৃথিবী, কেউ কেউ ভাবতো ওটা ‘মা’দের দায়িত্ব।

দায়িত্বের শেষ হয়না কখনো তোমার ‘মা’। অবুঝ শিশু কিইবা জানতো কখন রাত কিংবা কখন দিন, রাত জেগে থাকা শিশুটিকে কোলে নিয়ে তুমি আস্তে আস্তে হাটতে, গুন গুন করে গান ‘আমার সোনা মানিক, আমার সাত রাজার ধন’। ক্লান্তিতে তোমার চোখের নীচের কালো দাগ আরও গাঢ় হয়ে উঠতো। অথচ এই সমাজের অমোঘ নিয়ামবলী অনুযায়ী ‘মা’য়েরা ঘুমুতে পারবে না যখন সন্তানেরা জেগে থাকে। যদিও তোমার প্রতিটি অঙ্গে বেদনার নীলেরা চিরস্থায়ী বাসা বেধেছে, ক্লান্তিরা দখল করে নিয়েছে তোমার মনন, জীবন ও অস্তিত্ব তবুও ‘মা’ তুমি কখনো বলনি ‘আমি পারবো না’। অসীম সাহসী যোদ্ধার মতো একা যুদ্ধ করেছো এই পৃথিবীর বিরুদ্ধে – কারন তুমি ‘মা’।

তোমাকে ছায়া দেবার যে মানুষটা ছিলো একসময় সেও চলে গিয়েছিলো। কিন্তু তুমি অটল অনড় মহীরূহ হয়ে আমাদের শীতল ছায়ার নিচে রেখেছিলে। তুমি মা ও বাবা হয়ে সংসারের হাল অনড় হাতে ধরে এগিয়ে গিয়েছ পৃথিবীর পথে।

বড় বেশি অবুঝ ছিলাম, তোমাকে কষ্ট দিয়েছি অনেক কিন্তু তুমি কখনই আশাহত হওনি, চরম যন্ত্রনার মুখোমুখি হয়েও তুমি হাল ছেড়ে দাওনি। নিঃশব্দে একাকী নিজের আঁচলে মুছে ফেলেছো চোখ থেকে গড়িয়ে পরা তরল কষ্ট, কাউকে দেখতেও দাওনি। তোমার একক যুদ্ধে তুমি সফল হয়েছো ‘মা’। তোমার সন্তানদের গড়ে দিয়েছ জীবন। তোমার কারনেই আমরা স্বাবলম্বী। নিজের সখ, ইচ্ছা কিংবা আহ্লাদ কোনদিনই তোমার প্রয়োজনের তালিকায় লেখনি তুমি, শুধুই আমাদের প্রয়োজনগুলোকেই প্রাধান্য দিয়েছো। আমরা সবাই এতো বড় হয়ে গেছি যে এই এক অক্ষরের ছোট্ট শব্দ ‘মা’ কে সময় দেবার সময় কি আছে আমাদের বলো? আমরা এতোই বড় হয়ে গেছি তোমাকেই এখন ছোট মনে হয়, তোমার কষ্ট, ক্লান্তি, ত্যাগ এবং অপরিসীম ভালোবাসার ফল আমাদের জীবন। হয়তো কেউ কেউ বলবে এটা ‘মা’দের দায়িত্ব। সব মায়েরাই করে থাকে তুমিও করেছো।

আমাকে বছরের পর বছরে তিলে তিলে যত্ন করে, কত শত ঝড় পার করে বড় করে তুলেছো, মানুষ করেছো – কিন্তু সেই স্বার্থহীন ভালোবাসা সেটা কি শুধুই তোমার দায়িত্ব ছিলো?

ভালো থেকো মা, ভালো থেকো সব মায়েরা – কারন তোমাদের ভালো থাকতেই হবে আমাদের জন্য। যত বড়ই হইনা কেন, বিপদে, কষ্টে একটি শব্দই তো আমরা ডাকবো সে হচ্ছে ‘মা’।

শেয়ার করুন :