‘সফলতা রাতারাতি আসে না’

গ্রন্থণা: সুরাইয়া নাজনীন

সফলতা রাতারাতি আসে না। অনেককে রাতারাতি সফল হতে দেখে, এই ভুল ধারণা আমাদের মাঝে জন্মে যায়। কিন্তু সফলতার পেছনে যে কত রাতের পরিশ্রম রয়েছে, সেটি আমরা জানার চেষ্টা করি না। ভাগ্যের উপর নির্ভর করে বসে থাকলে, সাফল্যের ছোঁয়া পাওয়া বড়ই মুশকিল। এমনটাই বললেন নারী উদ্যক্তা আজমিরা সুলতানা। তিনি কতটা কষ্ট করে এই পর্যন্ত আসলেন, কিভাবে নিজের স্বপ্ন পুরণ করলেন সেই গল্প নিয়ে আজকের আয়োজন

 

উদ্যেক্তা হওয়ার পেছনের গল্প

আমি ছোটবেলা থেকেই আঁকতে ভালোবাসতাম। আমাদের সময়ে আঁকাআকিঁতে তেমন গুরুত্ব ছিল না। তবুও আমি লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে ছবি আঁকার জন্য রং তৈরি করতাম। যেমনঃ সিমের পাতা দিয়ে সবুজ রং, কাঁচা হলুদ দিয়ে হলুদ রং, লিপস্টিক দিয়ে লাল রং, সাদা কাপড়ের নীল পাউডার দিয়ে তৈরি করতাম নীল রং আরো কত কি! জীবনে অনেক সময় পেরিয়ে গেলো, আঁকা থেকে অনেক দূরে ছিলাম। বিয়ের পর ২০০৮ সাল থেকে আমার চাকরি জীবন শুরু। আমি একজন চারুকলা শিক্ষিকা। আমি কখনো চারুকলা বিষয়ক কোনো প্রশিক্ষণ নিই নি। পেইন্টিং নিয়ে কিছু করার ইচ্ছে থাকলেও, চাকরি ও সংসারের কারণে করা হয়ে উঠেনি। লকডাউন এর কারণে বাসায় অনেক সময় পেয়েছি, তাই এ সময়টিতে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেছি। আমি মাত্র ৫ হাজার টাকা দিয়ে অনলাইন থেকে রং, তুলি, ক্যানভাস অর্ডার করে প্রিইন্টিংয়ের কাজ শুরু করেছি। আমি আমার বিজনেস পেইজ ও কয়েকটি গ্রুপের মাধ্যমে আমার করা পেইন্টিং সেল করছি। এভাবেই আমার উদ্যোক্তা হওয়ার যাত্রা শুরু। আমার বিজনেস পেজের নাম মেয়েদের সৃজনশীল দক্ষতা।

 

 

সৃজনশীলতার মূল্যায়ন

ক্রিয়েটিভ কাজের প্রতি আকর্ষণ কমবেশি সবারই থাকে। বিশ্ব জুড়ে রয়েছে ক্রিয়েটিভিটির বিপুল চাহিদা। আমাদের দেশে ক্রিয়েটিভ কিছু করতে গেলেই, অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। যুগ পরিবর্তনের পাশাপাশি, পরিবর্তন হচ্ছে মানুষের পছন্দের। তাদের পছন্দের তালিকায় এখন সৌখিন জিনিসই বেশি। এর ফলে দেশে ক্রিয়েটিভিটির গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দেশীয় পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে বলুন

বর্তমানে দেশীয় পণ্যের চাহিদা ব্যপক হারে বেড়ে চলেছে। বর্তমানে দেশীয় পণ্য কেনার প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেড়েছে, কমেছে আমদানি করা পণ্যের প্রতি আগ্রহ। ক্রেতাদের এই মানসিকতা, দেশীয় পণ্যের চাহিদা কে অনেক বৃদ্ধি করবে। দিন দিন দেশীয় পণ্যের মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশে। ব্যবসা করার প্রথমে, দেশের বাহির থেকে পণ্য এনে বিক্রি করার কথা না ভেবে, দেশীয় পণ্য নিয়ে বেশি বেশি কাজ করা উচিত বলে মনে করি।

 

টিকে থাকার লড়াই

একজন উদ্যোক্তা হিসেবে টিকে থাকার জন্য আমরা অনেকে,অনেক কিছু জানি না। সেই দিক থেকে, নতুন কিছু করতে গেলে, নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে, ব্যবসার পাশাপাশি সংসারেও সময় দিতে হয়। তাই ব্যবসাটিকে টিকিয়ে রাখতে, রাতদিন কঠোর পরিশ্রম করতে হয়, ধৈর্য ধরতে হয় এবং যথেষ্ট আগ্রহী হতে হয়। আমাদের মনের মাঝে উদ্যোক্তা উদ্দীপনা না থাকলে, কোন সদস্যরা উৎসাহিত হবে না। একটি প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে গেলে, কাস্টমারদের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখা খুবই প্রয়োজন। ক্রেতা যখন খুশি হবে, তখন আপনি বুঝতে পারবেন, আপনি উদ্যোক্তা হিসেবে সফলতার দিকে এগিয়ে গেলেন।

তরুণরা উদ্যোক্তা হতে হলে

তরুণদের লক্ষ্য অর্জনে যথেষ্ট আগ্রহী হতে হবে। নিজের উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে, সততা ও ন্যায় পরায়ণতা প্রদর্শন করতে হবে। সবার নিজের সৃজনশীল দক্ষতা এবং সামর্থ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা অর্জন করতে হবে। তারপর, যে সব বিষয়ে আপনার দক্ষ মানুষ লাগবে, সেসব বিষয়গুলো খুজে বের করতে হবে। তারপর খুঁজে বের করতে হবে, বিষয়গুলোতে দক্ষ কিছু মানুষ। আপনি আপনার কাজকে যত সুন্দর করে মানুষের মাঝে তুলে ধরবেন, তার কদর ততো বাড়বে।

 

ব্যবসায়ে গুচ্ছ মেলার প্রভাব

নিজের কাজকে সকলের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে, গুচ্ছ মেলার গুরুত্ব অনেক বেশি। এর মাধ্যমে নিজের দক্ষতাটিতে সকলের কাছে সহজে তুলে ধরা যায়। তাছাড়াও, ক্রেতারা চাহিদা অনুযায়ী পণ্য যাচাই করে কিনতে পারে। আমি মনে করি সর্বস্তরের মানুষের কাছে, নিজের প্রতিভা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে, গুচ্ছ মেলা অনেক বড় ভূমিকা পালন করে।

পারিবারিক সহযোগিতা কতটুকু প্রয়োজন?

পরিবারের সহযোগিতা ছাড়া একটি নারীর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা খুবই কঠিন। পরিবারের সহযোগিতার কারণে, একজন নারীর আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায় এবং কাজের প্রতি আগ্রহটা বেড়ে যায়। সকল নারী উদ্যোক্তার সফলতার পেছনে পরিবারের সহযোগিতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বলে, মনে করি। আমার ক্ষেত্রেও আমার পরিবার আমাকে পুরোপুরি সমর্থন করে।

চাকরি এবং ব্যবসা কোনটি প্রধান্য পাবে ?

চাকরি নির্ধারিত সময় ও নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু, ব্যবসার ক্ষেত্রে বাঁধা ধরা কোনো নিয়ম নেই। ব্যবসার মাধ্যমে আপনি আপনার নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী, আপনার সৃজনশীলতা সবার কাছে তুলে ধরতে পারেন। আমি একজন চারুকলা শিক্ষিকা। আমি ছাত্র-ছাত্রীদের কিছু শিখাতে পেরে আনন্দ অনুভব করি। আর ব্যাবসার মাধ্যমে আমি আমার স্বপ্নটাকে বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। তাই আমার ক্ষেত্রে চাকরি এবং ব্যবসার দুটিই প্রাধান্য পাবে।

কোন বিশেষত্বের কারনে আমার পণ্যটি গ্রহণযোগ্য

অনেকেই ধারণা করে, অনলাইন থেকে পণ্য কিনলে তা মান সম্মত হবে না। তাই, আমি প্রত্যেকটি পণ্যকে মানসম্মত ও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করি। পণ্যের বিষয়ে ক্রেতাদের সাথে কথোপোকথনের মাধ্যমে, সুস্পষ্ট ধারণা দিয়ে থাকি। এর ফলে আরা বিশ্বাসের সাথে পণ্য ক্রয় করতে পারে।

 

একজন হারিয়ে যাওয়া কিংবা পিছিয়ে পড়া উদ্যোক্তার জন্য উঠে আসার শক্তি কি হতে পারে

সফলতা কোন সময় রাতারাতি অর্জিত হয় না। অনেককে রাতারাতি সফল হতে দেখে, এই ভুল ধারণা আমাদের মাঝে জন্মে যায়। কিন্তু সফলতার পেছনে যে কত রাতের পরিশ্রম রয়েছে, সেটি আমরা জানার চেষ্টা করি না। ভাগ্যের উপর নির্ভর করে বসে থাকলে, সাফল্যের ছোঁয়া পাওয়া বড়ই মুশকিল। কঠোর পরিশ্রম এবং নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসই হলো,একজন হারিয়ে যাওয়া ও পিছিয়ে পড়া উদ্যোক্তার উঠে আসার শক্তি।

পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা

আমি একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে বলতে চাই, সমাজভীতি, সময়ের অভাব, অলসতা ও পরিবারের কারণে আমরা অনেকেই নিজের দক্ষতাকে বিসর্জন দিয়ে থাকি। আপনারা যদি চান, কঠোর পরিশ্রম ও ধৈর্যের মাধ্যমে, নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে পারবেন। সবাইকে ধন্যবাদ।

শেয়ার করুন :