৬ ধরনের অপরাধ ঘটছে অবৈধ বিটকয়েনে

নিউজ ডেস্ক: অবৈধ ভার্চুয়াল মুদ্রা, বিশেষ করে বিটকয়েনের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলেও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অবৈধ ভার্চুয়াল মুদ্রা ব্যবহার করে ৬ ধরনের অপরাধ ঘটছে বাংলাদেশে। এর মধ্যে অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ক্রয়-বিক্রয়, বিদেশে অর্থপাচার, মানবপাচার, জঙ্গি অর্থায়ন এবং অনলাইন জুয়ার মতো অপরাধ হচ্ছে বেশি। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিটকয়েনের ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনতে নির্দেশনার পাশাপাশি বিটকয়েনের প্রযুক্তি সম্পর্কিত আধুনিক তথ্য ও জ্ঞানলাভে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে পুলিশের সাইবার ইউনিট এবং গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সফটওয়্যার সংগ্রহের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২ থেকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরে। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক কাজী জিয়া উদ্দিন স্বাক্ষরিত সেই চিঠির আলোকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য  পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার মাহমুদুল ইসলাম তালুকদার আমাদের সময়কে বলেন, বিটকয়েনসহ সব ধরনের ভার্চুয়াল মুদ্রা (ক্রিপোকারেন্সি) বাংলাদেশে নিষিদ্ধ। আগামীতে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে দেশে লেনদেন ও অপরাধ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা ও সরঞ্জামাদির প্রয়োজন রয়েছে। সিআইডির কর্মকর্তাদের এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে।

সিআইডির একজন কর্মকর্তা বলেন, উন্নত দেশগুলোতে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে মাদক ও অস্ত্রসহ বিভিন্ন অবৈধ জিনিস কেনাবেচা হয়। বাংলাদেশেও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ হচ্ছে। ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে ইন্টারপোল ও এফবিআইয়ের সঙ্গে সিআইডির কর্মকর্তারা একাধিক বৈঠক করেছে। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তারা প্রাথমিক কিছু প্রশিক্ষণ দেবে। তবে নজরদারির সরঞ্জামাদির দাম অনেক বেশি হওয়ায় এখনই তা কেনা হবে না। এ ছাড়া ডার্কওয়েব ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশকে তিন বছরের প্রশিক্ষণ দেবে। চলতি বছর থেকেই এই প্রশিক্ষণ শুরু হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশ্বব্যাপী কাগুজে মুদ্রার পাশাপাশি ডিজিটাল মুদ্রার ব্যাপক হারে প্রচলন শুরু হয়েছে। বিশ্বের সর্বপ্রথম ডিজিটাল বা ভার্চুয়াল মুদ্রা হলো বিটকয়েন। ২০০৮ সাল থেকে চালুর পর থেকেই বাংলাদেশে অবৈধ এই মুদ্রার ব্যবহার শুরু হয়েছে। বৈধ পণ্য ক্রয়-বিক্রয় ছাড়াও বিটকয়েনের মাধ্যমে মাদক, অস্ত্র, চোলাচালান, মানবপাচার, অর্থপাচারসহ নানা অবৈধ পণ্য কিংবার সেবার কেনাবেচায় বিটকয়েন ব্যবহার হচ্ছে। ব্যবহারকারীদের শনাক্ত এবং ব্যবস্থা গ্রহণ দুরূহ হওয়ার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের এর ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে মাদক, অর্থপাচার, অনলাইন ভিডিও গেমসের পেমেন্ট, অনলাইন জুয়া, মানবপাচারে বিট কয়েন ব্যবহার হচ্ছে বেশি। এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারও হয়ে যাচ্ছে বলে গোয়েন্দা সংস্থার ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত কয়েক বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক ইউনিট অভিযান চালিয়ে একাধিক বিটকয়েন ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে। গত বছরের ১২ জানুয়ারি বাংলাদেশে অবৈধ বিটকয়েন ব্যবসাচক্রের মূল হোতা হিসেবে রায়হান নামে যুবককে গাজীপুরের কালিয়াকৈর থেকে গ্রেপ্তার করেছিল র‌্যাব। এ ছাড়া ১২ মে রাজধানীর বাড্ডা এলাকা থেকে বিটকয়েন ব্যবসার মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগে ১২ জনের একটি চক্রকেও গ্রেপ্তার করা হয়। এর বাইরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ- সিআইডিও একাধিক বিটকয়েন ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ- সিআইডির ইকোনমিক ক্রাইম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিটকয়েন বা ডিজিটাল মুদ্রার মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। বাংলাদেশে কোনো ডিজিটাল মূদ্রার বৈধ অনুমতি নেই। বিটকয়েনের মাধ্যমে অন্যান্য অপরাধের পাশাপাশি অর্থপাচারের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। কারণ উচ্চমূল্য এবং পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ থাকায় অবৈধ সম্পদের মালিকরা এটি ব্যবহার করে সহজেই অর্থপাচার করতে পারেন। আমরা সব বিষয় মাথায় রেখেই কাজ করছি।

গোয়েন্দা সংস্থার ওই প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, যেহেতু বিটকয়েনের লেনদেন নিয়ন্ত্রণ ও এর ব্যবহকারকারীকে শনাক্ত করা যায় না, সেহেতু দেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রমে এর ব্যবহার আগামীতে আরো বেশি বেড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া দুর্নীতিতে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ বিটকয়েনে লগ্নি করতে পারে। জঙ্গি সংগঠনগুলোও বিটকয়েনের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে তাদের নাশকতামূলক কর্মকা- করতে পারে। বিটকয়েনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে মাদকদ্রব্য ও অস্ত্র ক্রয়-বিক্রয় আরও বেড়ে যাতে পারে বলেও ওই প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা জানান, দেশের অনেক ফ্রিল্যান্স্যার তাদের কাজের পারিশ্রমিক বিটকেয়েনের মাধ্যমে নিয়ে থাকে। ব্যাংক ব্যবস্থায় বিটকয়েন অবৈধ হওয়ায় তারা বিভিন্ন বিটকয়েন ব্যবসায়ীর মাধ্যমে তাদের ওয়ালেট থেকে টাকা সংগ্রহ করে, যা পরবর্তীতে বিদেশে পাচার হয়ে যায়।

গোয়েন্দা সংস্থার ওই প্রতিবেদনে বিটকয়েনের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ প্রতিরোধের জন্য বেশ কয়েকটি সুপারিশও করা হয়েছে। এর মধ্যে বিটকয়েন ব্যবহার রোধকল্পে বাংলাদেশ ব্যাংকের আওতাধীন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট- বিএফআইইউর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মনিটরিং জোরালো করতে হবে। পুলিশের সাইবার ইউনিটসমূহ এবং গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সফটওয়্যার সংগ্রহের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত দক্ষত অর্জনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিটকয়েন ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। দেশের প্রচলিত আইন যথা- বৈদেশি মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৪৭, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-সহ অন্যান্য আইনে বিটকয়েন প্রতিরোধ ও শাস্তি সংক্রান্ত কঠোর ধারা যুক্ত করার পরামর্শ।

শেয়ার করুন :