‘যোগ্যদের কাজ করে যেতে হবে’

নিউজ ডেস্ক: অনেক নীরবতা মনের মধ্যে জমিয়ে রেখেছিলেন গীতিকার রাসেল ও’নীল। মৃত্যুর কিছুদিন আগে বাসার মানুষের সঙ্গে কথা বলা কমিয়ে দিয়েছিলেন। একা ঘরে লেখালেখি করেই সময় কাটাতেন তিনি। মৃত্যুর তিন দিন পর গতকাল রোববার তাঁর ছোট ভাই রাশেদুল হাসান জানালেন সেসব। কখনোই এ রকম নীরব ছিলেন না রাসেল।

মিডিয়াপাড়ায় ঘুরে বেড়াতেন, গান লিখতেন, বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল লিখতেন, নাটকের চিত্রনাট্যও লিখতেন। আনন্দের গান লেখা ছেলেটা হঠাৎ করেই আত্মহননের পথ বেছে নিলেন কেন, অনেকের প্রশ্ন। তাঁর মৃত্যুর খবর বিনোদন অঙ্গনে সবাইকে হতবাক করেছে।

বেশ কিছুদিন কর্মহীন ছিলেন রাসেল। দেড় বছর ধরে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ছিল তাঁর। তবে কিছুই বুঝতে দেননি পরিবার ও কাছের মানুষকে। বিনোদন অঙ্গনের সেই চেনা জগৎ থেকেও নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন।

রাসেল ও’নীলের ছোট ভাই রাশেদুল হাসানের সঙ্গে কথা বলেও তেমনটাই জানা যায়। তিনি বলেন, ‘অনেক পরে আমরা জানতে পারি, বছর দেড়েক হাতে কোনো কাজ ছিল না তাঁর। করোনার সময় চাকরি ছেড়ে ঘরে বসে টুকটাক কাজ করতেন। লেখালেখিও একটু কমিয়ে দিলেন। দেখে বোঝা যায়নি যে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল। শেষ ছয় মাস ঘরের বাইরে খুব একটা বের হতো না। খাওয়ার সময় এক দুই বেলা গ্যাপ হয়ে গেলে আম্মা ডাকাডাকি করতেন। মারা যাওয়ার ঘটনা যেদিনের, তার আগের দিনও আমরা একসঙ্গে খেয়েছি। সেদিন দোকান থেকে সবার জন্য গ্রিল এনেছিল। আম্মাকে নিয়ে খেয়েছে, আমার জন্য রেখে দিয়েছে।’

বিনোদন অঙ্গনে রাসেল ও’নীলের হঠাৎ এই মৃত্যুসংবাদে অনেকে যেমন হতবাক, তেমনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। কেউ কেউ এই অঙ্গনের সিন্ডিকেটের দিকেও আঙুল তুলেছেন। কয়েক বছর আগে মঞ্চ, টিভি ও চলচ্চিত্রের অভিনেতা এবং পরিচালক তানভীর হাসানের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছিল পুলিশ।

তারিক আনাম খান বলেন, আমরা ভাবি যে সে সাধারণ নয় কেন—আসলে একটু অসাধারণ বলেই তো সে শিল্পী। সেই হিসেবে আমার মনে হয় আমরা যদি সংবেদনশীল না হই, তাহলে সৃষ্টিশীল জীবনগুলো এভাবে হারিয়ে যাবে
তারিক আনাম খান বলেন, আমরা ভাবি যে সে সাধারণ নয় কেন—আসলে একটু অসাধারণ বলেই তো সে শিল্পী। সেই হিসেবে আমার মনে হয় আমরা যদি

তানভীর ঢাকা লিটল থিয়েটারের সদস্য ছিলেন, পরে যোগ দেন নাট্যকেন্দ্রে। মৃত্যুর আগে কয়েক বছর কর্মহীন ছিলেন তিনিও। ক্ষুব্ধ পরিচালক মাসুদ হাসান উজ্জ্বল কোনোভাবেই মানতে রাজি নন, রাসেল ও’নীল বা তানভীররা অযোগ্য ছিলেন, অযোগ্যতার কারণেই তাঁরা কর্মহীন ছিলেন। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘রাসেল ও’নীল বা তানভীরদের ভয়ানক একটা ত্রুটি ছিল, সেই ত্রুটির নাম “আত্মসম্মান”, প্রকৃত শিল্পীদের যেটা থাকে। হাত কচলে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুকে শ্রেয় মনে করেছেন তাঁরা।’

অভিনয়শিল্পী ও নির্মাতা তারিক আনাম খানের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তানভীর হাসান। এই সংকটের কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অনেক সময় আমরা চারপাশের মেধাবী সহকর্মীদের অনেক সমস্যাই দেখি না। দেখলেও সংবেদনশীল হয়ে দেখি না। আমরা ভাবি যে সে সাধারণ নয় কেন—আসলে একটু অসাধারণ বলেই তো সে শিল্পী। সেই হিসেবে আমার মনে হয় আমরা যদি সংবেদনশীল না হই, তাহলে সৃষ্টিশীল জীবনগুলো এভাবে হারিয়ে যাবে। এগুলো কোনোমতেই কাম্য নয়।’

কুমার বিশ্বজিৎ বলেন, এই দেশে কেউ কাউকে উঠতে দেয় না। শিল্পীদের জায়গাটা নিজেকেই তৈরি করতে হয়। একজন শিল্পীকে প্রচণ্ড কৌশলী হতে হয় কুমার বিশ্বজিৎ বলেন, এই দেশে কেউ কাউকে উঠতে দেয় না। শিল্পীদের জায়গাটা নিজেকেই তৈরি করতে হয়। একজন শিল্পীকে প্রচণ্ড কৌশলী হতে হয় সংগীতশিল্পী ও সংগীত ঐক্য বাংলাদেশের মহাসচিব কুমার বিশ্বজিৎ বলেন, ‘এই দেশে কেউ কাউকে উঠতে দেয় না। শিল্পীদের জায়গাটা নিজেকেই তৈরি করতে হয়। একজন শিল্পীকে প্রচণ্ড কৌশলী হতে হয়। এখানকার পথটা অনেক পিচ্ছিল, একটু পিছলে গেলে হতাশায় ভুগতে হয়। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অযোগ্য লোকগুলো যখন বেশি কাজ করে, তখনো হতাশা কাজ করে। তবে এ ক্ষেত্রে যোগ্যদের মুখ ফিরিয়ে না নিয়ে কাজ করে যেতে হবে।’ খবর: প্রথম আলো

শেয়ার করুন :