বিভিন্ন বিতর্ক নিয়ে যা বললেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ

আকাশছোঁয়া ডেস্ক : অবসরকালীন ছুটিতে থাকা সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, তাকে ঘিরে নানা বিতর্ক বিষয়ে মুখ খুললেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বাতিল, আলজাজিরার ডকুমেন্টারি ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার ম্যান’, ভাইদের বিষয়ে নানা অভিযোগ, গত সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা, ব্যক্তিগত সহকারীর দুর্নীতির দায়ে পদচু্যতিসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলেছেন। জার্মানির সম্প্রচারমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগের প্রধান ‘খালেদ মুহিউদ্দিন জানতে চায়’ শীর্ষক অনলাইন টকশোতে গত ২৪ ডিসেম্বরের আলাপচারিতায় উঠে আসে এই জেনারেল সম্পর্কিত নানা দিক।

আলোচনার শুরুতেই উঠে আসে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে জেনারেল আজিজের ভিসা বাতিলের প্রসঙ্গটি। খালেদ মুহিউদ্দিন বিষয়টি নিয়ে তার কাছে সরাসরি জানতে চাইলে জেনারেল আজিজ আহমদ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কতগুলো আইনে বলা হয়েছে, কারো ভিসা যদি যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ বাতিল করে, সেটি তাকে নোটিশ করতে হবে। আমাকে কি তারা জানিয়েছে? আমি যখন ভিসার জন্য আবেদন করেছিলাম, তখন আমার স্হায়ী ঠিকানা, যোগাযোগ করার নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা দেওয়া হয়েছে। অন্য ১০ জন সাধারণ মানুষের মতো আমি নই, যে আমাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমি বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজখবর নিয়েছি। আমার ভিসা বাতিল করা হয়েছে এমন কিছু পাওয়া যায়নি। এ সম্পর্কিত খবর তারও নজরে পড়েছে উল্লেখ করে জেনারেল আজিজ বলেন, ‘কোনো সোর্স উল্লেখ না করে তারা একটা খবর দিয়েছে।’ এমন খবরের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চেষ্টা করেছিলেন কি না। এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, প্রয়োজন না পড়ায় এমন কোনো চেষ্টা করেননি। ‘এক দুই কোটি টাকা দেখান’ : তিনি শত শত কোটি টাকার মালিক কি না, এমন প্রশ্ন করেন সঞ্চালক। জবাবে আজিজ আহমেদ বলেন, ‘কয়েক শ কোটি নয়, আমাকে সামান্য কিছুর সূত্র দিন যাতে বাকি জীবন স্বাচ্ছন্দে্য কাটাতে পারি। শত শত কোটি নয়, যদি.. বলতে পারেন লক্ষ লক্ষ বা এক-দুই কোটি টাকা আছে তাহলে ওটা দিয়ে আমি পরিকল্পনা করব আমার ভবিষ্যত্টা স্বাচ্ছন্দ্য হতে পারে কি না।’ তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ মনগড়া হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। ব্যক্তিগত সহকারীর ‘পদচু্যতি’ : সেনাপ্রধানের দায়িত্ব ছাড়ার পরপরই তার ব্যক্তিগত সহকারীকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় বলে খবর বের হয়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশে ১৬তম সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমি যতটুকু জানতে পেরেছি, আমি যখন রিটায়ারম্যান্টে আসি তখন শুনেছি। সে অবসরে গিয়েছে।… ডিসিপ্লিন বলে একটা কথা আছে। দুর্নীতির বিষয়টি আরো গভীর।…অত সিরিয়াস যদি কোনো কিছু হতো ‘হি শুড হ্যাভ বিন ডিসক্লোজড ফ্রম দ্য সার্ভিস’। সেক্ষেত্রে আমরা অনেককে জেল দিয়ে থাকি, অনেককে বরখাস্ত করে থাকি। ‘হি ওয়াজ গিভেন নরম্যাল রিটায়ারম্যান্ট’।’ আলজাজিরার তথ্যচিত্র : চলতি বছরের ফেব্র‚য়ারি মাসে এই সেনাপ্রধান ও তার ভাইদের নিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার ম্যান’ নামে একটি অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র প্রকাশ করে। এ নিয়ে তখন তোলপাড় হয় বাংলাদেশে। এই তথ্যচিত্র প্রকাশের পর শুরুতে বিব্রত হয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন আজিজ আহমেদ। সেই সময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফরে থাকলেও সেখানে এর কোনো প্রভাব পড়েনি বলে দাবি করেন। তথ্যচিত্রে, অভিযোগ করা হয়েছিল ইসরাইল থেকে স্পাইওয়্যার ও সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ক্রয়প্রক্রিয়ায় জেনারেল আজিজ প্রভাব খাটিয়েছেন। এর উত্তরে তিনি দাবি করেন কেনাকাটাগুলো যখন হয় তখন সেনাপ্রধান হিসেবে এর সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। যদিও তিনি দায়িত্ব নেওয়ার এক দিন পর নজরদারি প্রযুক্তি ক্রয়ের স্বাক্ষর হয়, তিনি দাবি করেন, প্রক্রিয়াগুলো আগেই সম্পন্ন হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমি চ্যালেঞ্জ করছি কেউ যদি কোনো একটা ‘অ্যাভিডেন্স’ দিতে পারে যে আমি বিজিবিতে থাকাকালে, আমি সেনাপ্রধান থাকাকালীন আমার কোনো ভাই বা আত্মীয়কে বিজিবি বা সেনাবাহিনীর কোনো ‘আর্মস, ইকুয়েপমেন্ট, অ্যামুনেশন প্রক্রিউরম্যান্ট, কন্টাক্ট’ দিয়েছি এটা যদি কেউ প্রমাণ করতে পারে ‘আই উইল অ্যাকসেপ্ট অ্যানিথিং।’ ভাইদের জাতীয় পরিচয়পত্র : বাংলাদেশ গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, জেনারেল আজিজের দুই ভাই হারিছ আহমেদ ও তোফায়েল আহমেদ নতুন নাম আর ভিন্ন ঠিকানা ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছেন। এ বিষয়ে প্রশ্নের উত্তরে সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, ‘কত লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি লোকজন বিদেশে আছে তাদের কি নিজস্ব নাম পিতৃপরিচয় বা ঠিকানা কি একচুয়েলটা ইউস করছে?’ নাম-পরিচয় পরিবর্তনে তিনি প্রভাব খাটিয়েছিলেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘একটা উদাহরণ দেন কোনো জায়গায় আমি কাউকে টেলিফোন করেছি কি না, যে আপনি একে নির্দেশ দিয়েছেন যে এটা করে দাও। এ রকম কোনো অ্যাভিডেন্স কি আপনাদের কাছে আছে? কোর্সমেটের সঙ্গে ফোনালাপ : আলজাজিরার তথ্যচিত্রে জেনারেল আজিজ ও তার এক জন কোর্সমেটের কথোপকথন ফাঁস করা হয়। এ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে আজিজ আহমেদ বলেন, অডিওটি সঠিক নয়। নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা : ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন করা হয় তাকে। জেনারেল আজিজ বলেন, ‘সেনাবাহিনী একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী। এখানে চেইন অব কমান্ড চলে। যখন কোনো নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করা হয়, তখন সবাই ইলেকশন কমিশনের আন্ডারে চলে যায়। একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন করার জন্য সবকিছু করতে পারে নির্বাচন কমিশন। সেখানে কার কী দায়িত্ব, একেবারে স্পেসিফিক বলা আছে। আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে বলা আছে, সবগুলো জেলায় যাব, প্রয়োজন হলে উপজেলায় যাব। নির্বাচনে ম্যাজিস্ট্রেট বা যারা আছেন, আমাদের নির্দেশ দিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য আমরা দ্রুতই সেখানে চলে যেতে পারি। সে সব জায়গায় আমরা অবস্হান নিয়ে থাকি। সেখানে চাইলেই সেনাবাহিনীর যা কিছু করার এক্তিয়ার নেই।’ সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ :এই পর্যায়ে উঠে আসে তার সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি। জেনারেল আজিজ রাজনৈতিক বিবেচনায় সেনাপ্রধান হয়েছেন কি না, জানতে চাইলে সদ্য বিদায়ী এই সেনাপ্রধান বলেন, ‘সেনাপ্রধান নিয়োগ দেওয়া সরকারের এক্তিয়ার। ২০১৮ সালে এই আইন হয়েছে। তার আগে জেএসআইয়ের সুপারিশ অনুযায়ী চাকরি, অবসর, এগুলো হতো এবং সে অনুযায়ী সরকারের সুপারিশ অনুযায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়ে থাকেন। এখানে সাধারণ যে বিষয়গুলো বিবেচনায় আনা হয়ে থাকে, সেটা হলো কমান্ডো এক্সপেরিয়েন্স, ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট অ্যাবিলিটি, সার্ভিস প্রোফাইল, বিভিন্ন কোর্সে পারফরম্যান্স। আপনি যেটা বললেন, সিনিয়রদের ডিঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাকে যখন নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আমিসহ তিন জন লেফটেন্যান্ট জেনারেল ছিলাম। এই তিন জন থেকে যে কোনো এক জনকে সেনাপ্রধান করতে পারবে। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা বেশি ছিল, সেটা বিবেচনা করেই আমাকে সেনাপ্রধান করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়।’ 

 

শেয়ার করুন :