‘অনেকে মনে করেন শিল্পীরা বাতাস খেয়ে বেঁচে থাকে’

মাকসুদুল হক : দেশের কিংবদন্তী রকস্টার মাকসুদুল হক। গান লেখার পাশাপাশি নিজ কণ্ঠে অগণিত গান তিন প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয়। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের লোক গান নিয়েও গবেষণা করছেন। সাম্প্রতিক রয়ালিটি ও সংগীতশিল্পের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যত্ প্রসঙ্গে লিখলেন ইত্তেফাকে। পাঠকদের জন্য লেখাটি তুলে ধরা হলো—

‘ভবের গান গাইতে পারি না, আমার অভাবে ভাব জাগে না, আমি গান গাইতে পারি না’- শাহ আব্দুল করিম

অনেকে মনে করেন যে, শিল্পীরা গায়ে বাতাস খেয়ে দিন যাপন করে। তাই কী? নাকি কথাটি সম্পূর্ণ ভুল। আর ১০ জনের মতো আমরাও মানুষ। মানুষের মতো বেঁচে থাকার অধিকার আমাদেরও আছে এবং গলা বিক্রি করলেও আমাদের আত্মা ও শিল্পী-সত্তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করি না। পাশাপাশি কোনো মূল্যে বিক্রি করি না আমাদের সৃষ্টিকর্তার প্রদত্ত আত্মবিশ্বাস। আমাদের অতি কষ্টে সৃষ্ট অপার্থিব সম্পদ ‘গান’ বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে যে সমৃদ্ধ করেছে তা অনস্বীকার্য। তবে এ কারণে গানের শিল্পীদের ভাগ্যের ব্যাপক কোনো পরিবর্তন এসেছে এমনও প্রমাণ পাওয়া যায় না। অন্তত গত ১ বছরের বেশি সময় ধরে আমাদের বেঁচে থাকার উত্স টিভি অনুষ্ঠান, কনসার্ট, অডিও ভিডিও রেকর্ডিং, সংগীতের শিক্ষকতা বা গানের শিল্পীদের তালিম ইত্যাদি সব বন্ধ থাকা ও অনিশ্চয়তার কারণে কী মানবেতর জীবনযাপন গানের শিল্পীরা করছে, তা কেবল আমরাই জানি। আমরা যারা গান ছাড়া উপার্জনের অন্য কোনো পথ জানি না, চক্ষু লজ্জায় আমাদের দূরাবস্থার কথা কারো সঙ্গে শেয়ার পর্যন্ত করি না। যদি বিন্দুমাত্র ‘অহঙ্কার’ করার মতো কিছু থেকে থাকে, তা আমাদের এই অতি তীব্র আত্মসম্মানবোধ। লকডাউন বলবত্ থাক বা শিথিল হোক, সব কিছুই প্রকাশ্যে ও আক্ষরিক অর্থে ‘উন্মুক্ত’। সব জায়গায় মানুষের ভিড়। হোক সেটা শপিংমল, রাজনৈতিক মিটিং, ক্রিকেট ফুটবল খেলা, প্রচার প্রোপাগান্ডা, এমনকি ওয়াজ মাহফিলগুলোতেও শুনেছি তিল দাঁড়ানোর ঠাঁইটুকু থাকে না। অথচ যত সমস্যা শিল্পীদের গান করার ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রে। গানের শিল্পীরা মরার সময় অসুস্থ হয়ে অনাহারে দুঃস্থ শিল্পীর তকমা গায়ে লাগিয়ে মরবে, এ-তো এখন সাধারণের ‘স্বাভাবিক ধারণা’ কেবল নয়, রাষ্ট্রও তাই বিশ্বাস করে এবং তার জন্য রয়েছে ‘দুঃস্থ শিল্পীদের তহবিল’। এই তহবিলের অস্তিত্বই গানের শিল্পীদের শিল্পীসত্তাকে চরম অপমান করে ধূলিসাত্ করার জন্য যথেষ্ট-এই কথাতে কী কোনো গলদ আছে?

কী কারণে গানের শিল্পীরা উপেক্ষিত, কেন তাদের আজ অবধি বেঁচে থাকার জন্য প্রাণপণ লড়াই করতে হচ্ছে? প্রয়াত বন্ধু তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’ ছবিতে কিছু সময় কাজ করার সুবাদে প্রথম জানতে পারি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গানের শিল্পীদের দুঃসাহসিক ভূমিকার কথা। এতকিছুর পরও গানের শিল্পীদের প্রতি রাষ্ট্র বা সমাজের আদৌ কী কোনো দায়বদ্ধতা বর্তায়? যারা আমার এই আবেগপূর্ণ লেখাটা প্রথম থেকে ধৈর্যসহকারে পড়ছেন তারা নিশ্চয়ই এই প্রশ্নের কিছু উত্তর এতক্ষণে পেয়ে গেছেন। এ দেশের প্রকৃত অর্থে সংস্কৃতির ধস সেদিনই নামবে যেদিন গানের শিল্পীরা ভিক্ষার থালা নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরবে। বাংলাদেশের সূর্য সন্তানদের এ করুণ ভাগ্য যেন না ঘটে, তার জন্য অনতিবিলম্বে প্রয়োজন শিল্পকলা একাডেকিসহ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরে স্তুপ হয়ে থাকা আবর্জনা পরিষ্কার করে যোগ্য লোক দ্বারা নতুন করে ঢেলে সাজানো দরকার। এছাড়া সংস্কৃতি খাতে অনুমোদন দেওয়া জনগণের টাকার পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। সংস্কৃতিকে ‘প্রায়োরিটি সেক্টর’ ঘোষণা করা হোক। গানের শিল্পীদের রুটি রোজগার ছাড়াও মেধাসত্তা অধিকার, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর নির্লজ্জ আস্ফাালনসহ বহু গুরুতর বিষয় এখনো অমীমাংসিত। এখনো সময় আছে। প্রয়োজন একটা ‘ডাটাবেজ’, যেখানে তালিকাভুক্ত কেবল নয়, জননন্দিত ও গুণী শিল্পী সবাই তাদের সংস্কৃতি ও দেশের প্রতি অবদানের প্রমাণস্বরূপ অন্তর্ভূক্ত থাকবেন। দেশবাসীর হাতের নাগালেও থাকবে এই ডাটাবেজের এক্সেস।

 

লেখক : দেশবরেণ্য কণ্ঠশিল্পী, লেখক, লোকগবেষক

 

শেয়ার করুন :