মাইক্রোফাইন্যান্সের নামে অবৈধ সুদের ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতারক চক্রের ৫ সদস্য গ্রেফতার

আকাশছোঁয়া ডেস্ক : অ্যাপসভিত্তিক ডিজিটাল মাইক্রোফাইন্যান্সের নামে অবৈধ সুদের ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতারক চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এর গোয়েন্দা সাইবার এন্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ।

গ্রেফতারকৃতরা হলো ইমানুয়্যাল এডওয়ার্ড গোমেজ, আরিফুজ্জামান, শাহিনূর আলম ওরফে রাজীব, শুভ গোমেজ ও মোঃ আকরাম।

গত ০৫ ও ০৬ অক্টোবর, ২০২১ ধারাবাহিক অভিযানে ঢাকা মহানগরীর  ধানমন্ডি, বনানী এবং মিরপুর এলাকা হতে তাদেরকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা ওয়েব বেজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম। এসময় তাদের হেফাজত হতে ১টি অ্যাশ রংয়ের এলিয়ন গাড়ি, ০৯ টি মোবাইল ফোন,  ০৯ টি সিম কার্ড,  ৪ টি ল্যাপটপ ও ৪ টি বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বহি উদ্ধারমূলে জব্দ করা হয়।

৭ অক্টোবর বৃহস্পতিবার বেলা ১২ টায় ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানান ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার, বিপিএম(বার)।

ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, গ্রেফতারকৃতরা সরকারি অনুমোদন ব্যতীত থান্ডার লাইট টেকনোলজি লিমিটেড,  নিউ ভিশন ফিনটেক লিমিটেড ও বেসিক ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির নামে  আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে। আইনগত অনুমোদন ব্যাতীত তারা গ্রাহকের তথ্য সংগ্রহ করছে।  গ্রাহকরা উক্ত অ্যাপস ইন্সটল করার মাধ্যমে অ্যাপসে গ্রাহকের অজান্তে ক্যালেন্ডারের ইভেন্ট পড়া, গ্রাহকের অনুমতি ব্যাতিরেকে দূর নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে গ্রাহকের মোবাইল ক্যামেরা ব্যবহার করে ছবি ও ভিডিও ধারন, মোবাইলের কন্টাক্টস পড়াসহ মোবাইলের এক্সাক্ট লাইভ লোকেশন নির্ণয়, ফোনের স্ট্যাটাস এবং তথ্য সংগ্রহ,  ফোনে সংরক্ষিত মেসেজ পড়া, পরিবর্তন করার অনুমতি নিয়ে নেয়।  এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের পারসোনাল ডাটা সিকিউরিটির চরম হুমকিতে পরে।

তিনি আরো বলেন, গ্রেফতারকৃতরা অনলাইন অ্যাপস যেমন; Tkala – Personal Loans Online (Tkala. Thala-0430 ), Cashman (Cashman-0514, Cashman-0326), RapidCash- Quick Online eLoans App, AmarCash-Personal Loans Online, Cashkash-Fast Loans Online, ও CashCash এর মাধ্যমে জামানতবিহীন লোন দেওয়ার নামে চলে মাত্রাতিরিক্ত সুদের কারবার। এসকল অ্যাপসগুলোর সার্ভার চায়নাতে অবস্থিত এবং যেগুলো মূলত চায়না থেকে পরিচালিত হয়। কিছু চাইনিজ নাগরিক বাংলাদেশি নাগরিকের সহায়তায় বর্ণিত অ্যাপসগুলোর মাধ্যমে জামানতবিহীন স্বল্প সুদে লোন প্রদান করার নামে চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে গ্রাহক আকৃষ্ট করে। তাদের বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে গ্রাহকরা লোন গ্রহণ করার পর স্বল্প সুদের পরিবর্তে উচ্চহারে সুদ প্রদানের মাধ্যমে প্রতারিত হচ্ছে। প্রতারণার শিকার এক ভুক্তভোগীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে ধানমন্ডি থানায়  ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা রুজু হয়। এ মামলা তদন্ত শুরু করে গোয়েন্দা সাইবার এন্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ।

তিনি আরও বলেন, গ্রেফতারকৃত প্রতারকরা উপরোক্ত অ্যাপসগুলো ফেইসবুক, ইউটিউবসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বল্প সুদে জামানতবিহীন ঋণ প্রদানের নামে বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করে। তারা মূলত অর্থ সংকটে থাকা স্বল্প আয়ের লোকজন এবং বেকার ছাত্র-ছাত্রীদের টার্গেট করে। টার্গেটকৃত গ্রাহকরা বিজ্ঞাপনে প্রদর্শিত লিংকে ক্লিক করে কিংবা গুগল স্টোর হতে উক্ত অ্যাপসগুলো ডাউনলোড করে, চাহিত বিষয়ে পারমিশন দিলে অ্যাপসটি গ্রাহকের মোবাইলে ইন্সটল হয়ে যায়। এরপর গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্র, ফোন নাম্বার, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ফোন নাম্বার ও তাদের ব্যক্তিগত তথ্যসহ অন্যান্য তথ্য দিয়ে একাউন্ট খোলা হয়। চাহিদা অনুযায়ী আবেদনের প্রেক্ষিতে মাত্রাতিরিক্ত প্রসেসিং ফি নিয়ে এবং উচ্চ হারে সুদ নির্ধারন করে স্বল্প সময়ের জন্য ৩ থেকে ৭ দিনের জন্য ঋণ প্রদান করে। গ্রাহক ৩০০০ টাকার জন্য আবেদন করলে অনুমোদনের পর প্রসেসিং ফি বাবদ ৮১০ টাকা রেখে গ্রাহককে মাত্র ২১৯০ টাকা প্রদান করা হয়। ৭ দিন শেষে গ্রাহককে পরিশোধ করতে হয় মোট ৩,০১৮ টাকা। মেয়াদ শেষে অনাদায়ে প্রতিদিন হিসাবে গ্রাহককে উচ্চহারে সুদ প্রদান করতে হয়।  এ ছাড়াও অ্যাপ্লিকেশন ফি বাবদ ১২০ টাকা, ডাটা অ্যানালাইসিস ফি ১৮০ টাকা, মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ১৫ টাকা এবং সুদ বাবদ ৫ টাকা কেটে রাখার যুক্তি দেখায়। তবে, পরিমাণ যতো বেশি হবে টাকা কেটে রাখার প্রবণতাও বেশি। এ ঋণের টাকা গ্রাহককে বিকাশ অথবা নগদ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়। অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই। প্রতারকদের এ লোভনীয় অফারের ফাঁদে পরে অনেকে সর্বস্ব হারায়।

যে কোন অ্যাপস ইন্সটল করার পর অথবা কোন লিংকে প্রবেশ করার পর ব্যাক্তিগত কোন তথ্যাদি প্রদান করার পূর্বে নিরাপত্তার বিষয়টি ভালোভাবে নিশ্চিত হতে হবে। ব্যাক্তিগত তথ্য যত্রতত্র শেয়ার না করার অনুরোধ জানান পুলিশের এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

গোয়েন্দা গোয়েন্দা সাইবার এন্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম এর তত্বাবধানে অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার ফজলুর রহমানের সার্বিক তদারকিতে ওয়েব বেজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশ টিমের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার আশরাফ উল্লাহ এর নেতৃত্বে অভিযানটি পরিচালিত হয়।

 

শেয়ার করুন :