করোনা মহামারির প্রভাব পড়েছে সোনারগাঁওয়ে লোক ও কারু শিল্প মেলায়

এস এম হৃদয় রহমান : করোনা মহামারির প্রভাব পড়েছে নারায়নগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে মাসব্যপী লোক ও কারু শিল্প মেলায়। শুক্রবার ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও মেলায় লোক সমাগম তেমন ছিল না বললেই চলে। অন্যান্য বছর মেলাকে ঘিরে যেরকম মানুষের ঢল দেখা যায়, সেরকম কোন ঢল এবার চোখে পড়ে নি। তবে অনেকে মনে করছেন আরও কিছুদিন গেলে হয়ত মেলা আরও জমে উঠতে পারে। করোনা মহামরির কঠিন সময়কে উপেক্ষা করে ছুটির দিনে যারাই মেলাকে উদ্যেশ্য করে সোনারগাঁওয়ে ঘুরতে এসেছেন তাদের জন্য দিনটি ছিল অন্য রকম। কেউ নৌকায় করে লেকে ঘুরছেন মনের আনন্দে। শিশু-কিশোরদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে মেলায় থাকা তাদের জন্য হরেক আয়োজনে। হাতের তৈরি দেশীয় পণ্যের পসরা থাকলেও ক্রেতা সমাগম কম থাকায় মেলায় আসা ব্যবসায়ীদেরও অনেকটা চিন্তায় ফেলেছে। তবে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন মেলার দিন আরও গড়ালে ক্রেতা সমাগম আরও বাড়তে পারে। দর্শনার্থীর অভাব না থাকলেও ক্রেতার অভাব বলেই মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

এবারের মেলায় দেশীয় পাটের তৈরি ব্যাগ, কাপাড়, সোনারগাঁওয়ের জামাদানী শাড়ী, দেশীয় অন্যান্য শাড়ী, থ্রি পিছ, গ্রামীণ পোশাক, বাঁশের তৈরি ঘরোয়া শোপিজ, শিতলপাটি, শখের হাঁড়ি, মিষ্টি মন্ডা মিঠাই, টমটম গাড়ী শিল্প, তাঁতের কাপড় চোপড় তৈজসপত্র, মাটির তৈরি খেলনা, গ্রামীণ খাবার, মাটির হাড়ি পাতিলসহ মাটির তৈরি নানা শোপিজও রয়েছে মেলায়।

পুতুল নাচের আসর থেকে নাগরদোলায় চড়ে ছোটবেলায় ফিরে যেতে দেখা গেছে বড়দেরকে। এবারের মেলায় নজর কেড়েছে গ্রাম বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য থেকে হারিয়ে যাওয়া বায়োস্কোপ। তবে লোক ও কারু শিল্প মেলায় সেই লোক ঐতিহ্যের বায়োস্কপ নিয়ে এসছেন রাজশাহীর বাগামারার আব্দুল জলিল মণ্ডল। তার বায়োস্কোপের আসরে ছোট ছোট শিশুদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মত। ছোট শিশু টুনটুনি বলেন, বায়োস্কপ আমি আগে কখনও দেখি নি, এবারই প্রথম। এরকম জিনিস এবার প্রথম দেখেছি। মনে হচ্ছে আরও কয়েকবার দেখি।’

ঢাকা থেকে আসা এক দর্শানর্থী ঘুরতে এসেছেন তার শিশু মেয়ে তামান্না প্রাচীকে নিয়ে। তিনি বলেন, ‘ প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে আসি। গতবার করোনার কারণে পহেলা বৈশাখে আসা হয় নি। করোনার মধ্যে অনেক দিন বাসায় থাকতে হয়েছে। এখানে আমরা প্রতি বছরই আসি তবে এবার লোকজন কমই মনে হচ্ছে। আমি আমার শিশু মেয়েকে নিয়ে ঘুরতে এসেছি। ঢাকা থেকে একটু দূরে ছুটির দিনে ঘুরে বেড়ানো।’ তামান্না প্রাচী বলেন, ‘প্রকৃতির গাছের ছায়া এগুলো আমার ভাল লাগে। মেলায় কাঠের বিভিন্ন তৈজসপত্র খেলনা পাওয়া যায়। সেগুলো আমার ভাল লাগে। তাছাড়া মাটির তৈরি বিভিন্ন জিনিসগুলোও ভাল লাগে। এছাড়া এখানে বায়োস্কোপ দেখা, নাগরদোলায় চড়া এগুলো ভাল লাগে।’

সিলেটের মৌলভীবাজারের শিতলপাটির স্টলে কারিগর অজিত কুমার বলেন, ‘এবছর তো মেলার সিজন আগেই চলে গেছে। এখন আন সিজনে মেলা হচ্ছে। লোকজন একটু কম, বন্ধের দিন হওয়ায় একটু লোকজন বেড়েছে। বেঁচা কেনা তেমন হচ্ছে না।’

 

লোক ও কারু শিল্প মেলায় পাটের তৈরি বিভিন্ন পন্যের একটি স্টলে ক্রেতারা 

 

ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা যুথি তার পরিবার নিয়ে সোনারগাঁওয়ের জাদুঘরে ঘুরতে এসেছেন মেলা কে উপলক্ষ করে। তিনি বলেন, ‘ মেলাটা খুব ভাল লেগেছে। সাধারণের মধ্যে খুব সুন্দর একটা আয়োজন। পাটের ব্যাগগুলো দেখলাম আমার কাছে খুব ভাল লেগেছে। চেষ্টা করি পরিবেশ বান্ধব কিছু ব্যবহার করার। এই জিনিসটা আমার খুব ভাল লেগেছে। ছোটবেলার অনেক জিনিস দেখলাম এরমধ্যে পুতুল নিয়ে নিলাম। সোনারগাঁওয়ের জামদানী শাড়ী দেখব। আসলে এগুলো সব একসঙ্গে দেখতে পারাটা খুবই ভাল লাগছে। আমি খুব এক্সাইটেড।’

সিলেটের খাদিমনগরের মনিপুরী হস্ত শিল্পের স্টলে তাঁতী রেহানা বলেন, ‘এই মনিপুরী হস্তশিল্পটি আমাদের ঐতিহ্য। এই তাঁতের কাজ আমার দাদি, দাদা ওদের কাছ থেকে শেখা। আমরা শাড়ী, ওড়না, চাদর, থ্রিপিছ, গামছা, মাফলার থেকে শুরু করে একটা পরিবারের যাবতীয় যে কাপড় চোপড় দরকার হয় তা আমাদের তাঁতের মাধ্যমে আমরা তৈরি করি। ১৬/১৭ শ থেকে শুরু করে ৫/৭ হাজার টাকা দামের শাড়ীও আমরা তৈরি করি। ১ মাসের মেলা মাত্র চারদিন গেল, দেখি হয়ত সামনে ক্রেতা বাড়বে।’

লোক ও কারু শিল্প ফাউন্ডেশনের দেয়া তথ্য মতে, এবার মেলায় স্টলের সংখ্যা রয়েছে সবমিলিয়ে ১শ টি। এরমধ্যে ৪২টি হস্ত শিল্প, ২৪টি কর্মরত কারু শিল্পী, ১২টি জামদানী, ৮টা উদ্যোক্তা, বিভিন্ন দেশীয় খাবারের ২০টি স্টল, পোশাকের রয়েছে ১৪টি স্টল। মেলায় সান্ধ্যকালীন সাংস্কৃতিক আয়োজনও থাকে। মেলা গত ১লা মার্চ থেকে শুরু হয়েছে এবং শেষ হবে আগামী ৩১ শে মার্চ।

 

শেয়ার করুন :