৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে সমাবেশ

আকাশছোঁয়া ডেস্ক : বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশন ঢাকা মহানগর শাখার উদ্যোগে ৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিল, চিনিকল-পাটকল আধুনিকায়ন করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে চালু, শ্রমিকদের বকেয়া বেতন অবিলম্বে পরিশোধ, আখচাষীদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধের দাবিতে ১ জানুয়ারি শুক্রবার শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সংগঠনের মহানগর শাখার সভাপতি রাজু আহমেদের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস্ বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা, বাসদ (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় কার্যপরিচালনা কমিটির সদস্য কমরেড ফখ্রুদ্দিন কবির আতিক, বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি জহিরুল ইসলাম, সহ-সভাপতি মানস নন্দী, শ্রমিকনেতা মাসুদ রেজা, কাঞ্চন রায়, ভজন বিশ্বাস, মানিক হোসেন,  মোহাম্মদ গোফরান প্রমুখ।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ৬টি চিনিকল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। চিনিকলগুলো বন্ধ হলে ১ লাখেরও বেশি শ্রমিক-কর্মচারী চাকুরি হারাবে। আখ চাষের সাথে যুক্ত প্রায় ৫ লাখ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা জানি চিনিকলগুলোকে ঘিরে গড়ে উঠেছে লোকালয়, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ আরও বহু কিছু। একে ঘিরেই বহু মানুষের জীবিন-জীবিকা আর বেঁচে থাকা। অথচ, সেসব মানুষের ভবিষ্যতের কথা না ভেবেই সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত মোট চিনিকলের সংখ্যা ১৫টি। এরমধ্যে ব্রিটিশ আমলে ৩টি, পাকিস্তান আমলে ৯টি এবং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ৩টি গড়ে ওঠে। চিনিকলগুলোতে উৎপাদিত চিনি খাদ্য নিরাপত্তা, বাজার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচের হাত থেকে দেশকে বাঁচিয়ে দেয়। বিএসএফআইসির মতে, দেশে বার্ষিক চিনির চাহিদা প্রায় ১৪ লক্ষ টন। ২০০২ সালের আগ পর্যন্ত বিএসএফআইসি এককভাবে সারাদেশে চিনি উৎপাদন ও আমদানি করে নির্ধারিত দরে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছে দিত। এতে একদিকে ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষিত হতো। অন্যদিকে দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিকশিত হওয়ার সুযোগ ছিল। ২০০২ সাল থেকে মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে চিনি আমদানি অবাধ করা হয়।

এখন আমাদের ভাবা জরুরি – চিনি আমাদের  কতটুকু প্রয়োজন? আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা কত এবং কী পরিমাণ আমদানি করা দরকার?

উৎপাদনে নিয়োজিত শ্রমিক-কর্মচারীরাও ভালো নেই। সরকার ২০১৫ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে নতুন বেতন ও মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করে। কিন্তু চিনিকলগুলোতে তা বাস্তবায়িত হয়নি, বকেয়া আছে শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বেতন। এর পরিমাণও কয়েক কোটি টাকা। এই অবস্থায় তাদের কষ্ট অবর্ণনীয়। কেন সময়মত বেতন পরিশোধ করা হয় না – এ প্রসঙ্গে মিল কর্তৃপক্ষের বরাবর উত্তর – ‘চিনি বিক্রি না হওয়ায় বেতন দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।’

আজ চিনিকলগুলো বহুমাত্রিক সংকটে জর্জরিত। অথচ ২০ বছর আগেও এসব চিনিকলের বার্ষিক উৎপাদন ছিল প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন। মিলের যন্ত্রপাতি মেরামত ও আধুনিকায়ন না হওয়ায় উৎপাদন ক্ষমতা কমে বর্তমানে ৬৮ হাজার টনের কাছাকাছি চলে এসেছে। যন্ত্রপাতি পুরাতন হওয়ায় কমছে  উৎপাদন, উল্টো বাড়ছে উৎপাদন খরচ। প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে ব্যয় হচ্ছে সর্বনিম্ন ৮৮ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২৩২ টাকা পর্যন্ত। মিলগেট থেকে উৎপাদিত চিনি বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি দরে। উৎপাদন খরচ বেশি, অথচ বিক্রি কম দামে তাই লোকসান হচ্ছে। পূর্বে এই কলগুলো লোকসানী ছিলো না। এখন প্রশ্ন, বর্তমানে এই লোকসান কি দূর করা সম্ভব নয়? লোকসানের অজুহাতে বিরাষ্ট্রীয়করণই কি সমাধান?

কিন্তু যে কথা জানা দরকার তা হলো – এই লোকসানের সমস্তটাই আরোপিত। বিরাষ্ট্রীয়করণের সাথে পুঁজি বিনিয়োগের গভীর যোগসূত্র বিদ্যমান। অর্থাৎ কারখানাগুলো বেসরকারি খাতে চলে গেলেই পুঁজিপতিদের বিনিয়োগ করে মুনাফা কিংবা সরাসরি লুণ্ঠনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। সরকারের পক্ষে বিরাষ্ট্রীয়করণকে কৃতিত্ব হিসেবে দেখানো হয় এবং এর পক্ষে প্রচার চালিয়ে জনমত তৈরি করা হয়। এ লক্ষ্যে ১৯৯৩ সালে গঠিত হয় প্রাইভেটাইজেশন বোর্ড এবং ২০০০ সালে প্রাইভেটাইজেশন কমিশন। এই প্রতিষ্ঠান দুটির কাজই হচ্ছে লোকসানের অজুহাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যক্তিমালিকদের হাতে তুলে দেওয়া। এবং তা করা হয় নামমাত্র মূল্যে। একটি রিপোর্টে প্রকাশ – ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ৬০ শতাংশের অধিকই অস্তিত্বহীন ও বাকি প্রায় ৪০ শতাংশের অবস্থা রুগ্ন এবং বেহাল। অনেকক্ষেত্রে যে শর্তে রাষ্ট্র ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেয়, মালিক সে শর্ত মানেন না। অবাধ লুটপাট আর দখলদারিত্ব কায়েম হয়। ফলে বর্তমানে সরকারের এই তৎপরতা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারিকরণ-বাণিজ্যিকীকরণের ষড়যেন্ত্ররই অংশ।

বক্তারা পুঁজিপতিদের স্বার্থরক্ষাকারী এই সরকারের চিনিকল- পাটকলসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

 

শেয়ার করুন :