‘যেটা নিয়ে কাজ করবেন, সেই বিষয়ে প্রচুর পড়াশোনা করে নিন’

গ্রন্থণা- সুরাইয়া নাজনীন

বাবাকে জন্মের পর হারিয়েছি। তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে আমি ছোট। বাবার মৃত্যুর পর বড় ভাই বাবার দায়িত্ব পালন করেন। সেই ভাইকেও হারালাম কিছুদিন আগে। শুরুটা ঠিক ক্লাস সেভেনে, শখের বসে করি। প্রাক্টিক্যালের ওয়াল ম্যাট করতে গিয়ে হাতের কাজের প্রেমে পড়ে যাই। হাতের কাজের সুনাম স্কুল ও এলাকায় ছড়িয়ে যায়। বলছিলাম সুরাইয়া খানম রত্নার গল্প, তিনি জানালেন উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনের কথা

একবার এক ফ্যাক্টরির কয়েকটা ড্রেস ডিজাইন করে দিয়েছিলাম। তারপর সেই ফ্যাক্টরি থেকে ৩০০০ অর্ডার পায়।

সমস্যার কারনে ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে ভর্তি হতে পারিনি। এইচ এস সির পর পড়া বন্ধ করে দিলাম নিজেই। এলাকায় একটা বুটিকস সপ দিলাম। আমি একমাত্র মেয়ে যে ঐ এলাকায় ঘাসফুল নামে একটা সপ দেই। যার কারনে আমাকে কেউ ভালো ভাবে দেখেনি। আমার সপে ব্লক, এমব্রয়ডারি , কারচুপি, টেইলরিংসহ রেডিমেডও সেল হত দেশীয় পোশাক।
আমার কাজ দেখে এক আন্টি জয়ীতা (ধানমন্ডি রাপা প্লাজাতে ছিল) সেখানে ৫৬নং দোকান আমাকে নিয়ে দেয়, কোন টাকা ছাড়া। ৬ মাস জয়ীতা ও ঘাসফুল নিয়ে অনেক বেশি পরিশ্রম করি। জয়ীতাতে আমি জনপ্রিয়তা পাই ছোটদের রেডিমেড শাড়ি দিয়ে। ভালই নাম করি। কিন্তু অসুস্থ হয়ে যাই। পরে না চাইতেও জয়ীতা ছেড়ে দেই। কারন উত্তরা থেকে ধানমন্ডি আসা যাওয়া অনেক কষ্টকর ছিল। কাজই জানতাম তখন বিজনেস বুঝতাম না। তাই হোঁচট খেতাম বেশি ।

২০১৬ তে মানুষের কথা বিশ্বাস করে নিজের স্বপ্ন ঘাসফুল বিক্রি করে মালয়েশিয়া যায় পড়া শেষ করতে। ফ্যাশন ডিজাইনিং পড়তে গেলেও পড়া হয় হোটেল ম্যানেজমেন্ট । কিন্তু আমি হাল ছাড়ার মেয়ে না। একবছরের মাথায় মেসিন কিনে ঘরে টেইলরিং শুরু করি। প্রচুর পরিমান নাইজেরীয়ান, মালাই, ইন্ডিয়ান ও বাঙালিদের অর্ডার পেতাম। আমার ব্যক্তিগত ব্রানডিংয়ের কারনে তারা অর্ডার দিত। নিজে অর্ডার নিয়ে এসে আবার নিজেই দিয়ে আসতাম। ভালো সুনামের কারনে, যেখানে জব করতাম তারাও তাদের কোম্পানির অর্ডার দেয়। বেশ কিছু বড় অর্ডার করি।

 

সেখানে দোকান নেই। কিন্তু ভাগ্য সেখানেও আমাকে বাঁধা দেয়। ২০১৮ মাঝামাঝি অসুস্থ হয়ে সব বাদ দেই। ২০১৯ এর মাঝামাঝি বাংলাদেশে আসি। দেড় বছর বেড রেস্টে থেকে ২০১৯ এর অক্টোবরে আবার ন্যাশনাল ইনস্টিউটে ফ্যাশন ডিজাইনিং এ ভর্তি হই। কিছুদিন পর আবার অসুস্থ। ডা.বললেন জার্নি করা যাবে না। তাই ডিসেম্বরে ড্রিম জোন নামে ইন্ডিয়ান ইনস্টিউটে আবার ভর্তি হই। এটা উত্তরা। আমার কাছাকাছি।

২০২০ এর জানুয়ারিতে বিডি ট্রেইলর শুরু করি। প্রথম তিন মাস খুব ভালো সারা পাই। আলহামদুলিল্লাহ! তারপর শুরু হয় করোনা। আমার পড়া ও বিজনেস দুটোই বন্ধ হয়।

পাগলের মত যখন অবস্থা তখন হঠাৎ উই গ্রুপের দেখা পেলাম। জুনের শেষে। তখন মনে সাহস নিয়ে নতুন করে কিছুটা পরিবর্তন করে শুরু করলাম।

আমি যখন ২০২০শুরু করি তখন আমি মাত্র একজন নারী নিয়ে কাজ শুরু করি। ডেলিভারির সিস্টেম জানতাম না বলে নিজে গিয়ে পুরো ঢাকা থেকে অর্ডার আনতাম ধানমন্ডি, মিরপুর, গুলশান, বাডডা, খিলগাঁও, উত্তরা সব জায়গাতেই যেতাম নিজে।প্রথম তিন মাস নিজে গিয়ে কাজ এনে নিজে কেটে রেডি করে আবার নিজেই দিয়ে আসছি। আর এখন এলাকার মহিলাদের নিজেই ফ্রি কাজ শিখিয়ে ৭জন নিয়ে কাজ করছি নিজের ঘরেই।

এতো কিছু রেখে এটা নিয়ে লেগে থাকা কারন আমি ছোট থেকে ফিল করেছি যখন আমি কোন ডিজাইন কল্পনা করি, সেটা যতই টেইলরকে বুঝাই তারা সঠিকটা বুঝে না। বুঝলেও ভালো হয় না।তাই আমার কথা ডিজাইনার যখন ডিরেক্ট টেইলর হবে তখন সমস্যা কম হবে। তাছাড়া এই লাইনে শিক্ষিত মানুষ একটু কম।
আর একটা ব্যপার তা হল আমরা মোটা মুটি সবাই এখন ব্যস্ত থাকি। বিশেষ করে যারা কাজ করেন। তাই তাদের যেন টেইলরের কাছে দিয়ে হয়রানি হতে না হয় তাই অনলাইন চিন্তা। যেন তারা ঘরে বসেই যখন তখন অর্ডার করতে পারেন। এতে করে অনেক সময় বাঁচবে তাদের।

 

আমার কাছে ফ্যাশনের গুরুত্ব কতটা তা বলে বুঝাতে পারবো না। এটা আমার ভিতরে একটা নেশার মত কাজ করে। আমি সব কিছুতেই ফ্যাশন আনতে চাই।

কয়েক বছর আগেও অনেক মহিলা বা বড় আপুদের দেখতাম তারা শাড়ী মানে ঝামেলা মনে করতো। তারা ম্যানেজ করতে পারতো না। কিন্তু আমি বিশাল শাড়ি প্রেমিকা। ছোট থেকেই সুযোগ পেলেই শাড়ী। তাইতো ২০১৮ মালয়েশিয়া ত্রইকা স্কাই ডাইনিং কোম্পানির এ্যানুয়েল ফাংশনে বেস্ট ড্রেসের এ্যাওয়ার্ড পাই। সেখানে এতো সুন্দর ও গরজিয়াস ডিজাইনের ড্রেস পরা মেয়ে থাকতেও আমাকে পুরষ্কৃত করে কারন আমার শাড়ি ও আমার ব্লাউজ ।

ব্লাউজ তৈরি করে সাড়া পায় আলহামদুলিল্লাহ। বিশেষ করে উই থেকে অনেক অনেক অর্ডার এসেছে। এই ছয় মাসে ২০০ এর উপরে ব্লাউজ করা হয়েছে।

এদেশে ক্রিয়েশনের মূল্যায়ন অনেক অনেক বেশি। সেটা আমরা এতদিনে না বুঝলেও এখন খুব ভালো ভাবে বুঝতে পেরেছি। আর সেটা সম্ভব হয়েছে উইয়ের মাধ্যমে। উইতে ঢুকলেই আমরা এখন লাখ মানুষের ক্রিয়েটিভিটি দেখতে পাই। উইয়ের সাহসে সাহস পেয়ে ঘরের গৃহিনীও তার ভিতরের ক্রিয়েটিভিটি খুজে বের করতে সক্ষম হয়েছে। দিন দিন আরও অনেক বাড়বে। মুল্যায়ন পাচ্ছে বলেই বাড়ছে।

দেশীয় পণ্যের গ্রহন যোগ্যতা সবার প্রথমে। এটা শুধু আমার কাছে না, বেশির ভাগ মানুষের কাছেই। মাঝের কিছু সময় ইন্ডিয়ান সিরিয়াল দেখে কাপড় চোপড় পরার একটা ঝোঁক তৈরি হলেও তা এখন কমে আসতেছে। এক সময় তা একেবারেই কমে যাবে। কারন আমাদের দেশীয় প্রতিটা জিনিস যখন হাতের নাগালে সাধ্যের মধ্যে পেয়ে যাব তখন দূর দেশে কেন টাকা দিতে যাব। আর সেটা সম্ভব। আজ উইতে চোখ বুলালেই সেই বিশ্বাস অনেক বেড়ে যায়। আমরা পারবো। অবশ্যই পারবো।

আমাদের সমাজের গোড়ামি, খোঁচা মেরে কথা, পরিবারকে চাপ দেয়া, লজ্জা দেয়া, হাসি তামাশা করা। এগুলো নরমাল ব্যপার।এসব ঠিক হতে অনেক সময় লাগবে। তাই এসব সহ্য করেই এগিয়ে যেতে হবে।

যেমন আমার আত্বীয় আমাকে বলে, কিরে এতো টাকা রাখবি কই, তোর পরিবার কি তোর টাকায় চলে, মেয়ে কই কই যায়,ও আর ভালো নেই। বিয়ে করে না কেন। এসব হাজারও প্রশ্ন প্রতিদিন শুনতে হয়। তারপর অনলাইনে অর্ডার করার অজুহাতে বাজে কথা বলা, পন্যের বাজারে মানুষের দৃষ্টি ভংগি, কারীগরের তালিবালি, ডেলিভার সমস্যা, মধ্যবিত্ত পরিবারে টাকার সমস্যা, কাছের মানুষ বাকি নিয়ে টাকা না দেয়া। সব মিলিয়ে অনেক কিছু পার করে সব কাজ করতে হয়। এসবের পর তো ঘরের কাজ আছেই। সেটা তো বাদই দিলাম। মোট কথা একটা চ্যালেনজিং জীবন নারী উদ্যক্তাদের।

বর্তমানে বিজনেস যেমন সহজ আবার তেমনি কঠিন। এখানে শুরু করা সহজ হলেও টিকে থাকা কঠিন। তাই তরুণদের বলব, প্রচুর পরামানে পড়ার অভ্যাস করতে হবে। বিশ্ব বাজারের খবর, ই কমার্স, এফ কমার্স, পণ্য সোরসিং, কাস্টমার সার্ভিস ,পেইজ, ডোমেইন, পণ্য প্রেজেনটেশন, পণ্য বাজারের অবস্থা সব জেনে বুঝে পরে ভাল লাগার পণ্য নিয়ে কাজ করতে হবে। অন্যের দেখে নেমে যাওয়া বোকামি। আর যেটা নিয়েই কাজ করুন সেটা নিয়ে আগে পডা শুনা করুন। আর এসব কিছুর জন্য ডিএসবি গ্রুপ সেরা। সেখানে আর উইতে গিয়ে নিজের স্কিল ডেভেলপ করে নামলে ভালো হবে।

 

ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে গুচ্ছ মেলার গুরুত্ব অনেক বেশি। তবে আমার এখনও সুযোগ হয়ে উঠেনি।

নারীর জন্য পরিবারের সাপোর্ট অনেক গুরুত্ব পূর্ন। উদ্যক্তা জীবনে পরিবারের সাপোর্ট মানে অর্ধেক কাজ এগিয়ে যাওয়া।
এদিক দিয়ে আমি ভাগ্যবতী। পরিবার ছাড়াও যে মানুষটি সব সময় আমার পাশে ছিল সে আমার বান্ধবী টুশন। সব সময় ও আমাকে উৎসাহ দিয়ে গেছে ।

আমার টেইলরিংয়ের পাশাপাশি যে পণ্যগুলো সেলের জন্য করি।তার ৯০% ডিজাইন আমি নিজে করি। আর কাস্টমারদের জন্য থাকে কাস্টমাইজ করার সুযোগ। যার কারনে যে কোন পণ্য কাস্টমার চান মন মত করে নিতে পারে। সেটা সাইজ বলেন বা কাপড় বা রং। সবই তার ইচ্ছা মত করে দেই।

আমি জীবনে হোঁচট খেতে খেতেই এসেছি। যতবার খাই ততবার আবার নিজেই উঠে দাড়াই। আমি মনে করি হেরে যাওয়া মানে হল জয়ী হওয়ার জন্য নিজেকে নতুন করে তৈরি করা। আপনি যদি মনে করেন হেরে গেছেন তাহলে ভাবুন আপনার কোন দিকটা দুর্বলতা ছিল। পরে সেটা স্ট্রং করে আবার নেমে পড়ুন।যতক্ষন না জয়ী হন, হার মানবেন না। যত কষ্টই হোক নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখুন। প্রবল ইচ্ছা শক্তি, আপনার ধৈর্য, পরিশ্রমই পারবে আপনাকে জয়ী করতে। তবে আপনি যদি আপনার ভিতরের কমতি গুলো দূর করতে চান তাহলে ডিএসবি ও উইতে দিয়ে পড়েন ও দেখেন। নিজেই নিজেকে তৈরি করতে পারবেন

শেয়ার করুন :