‘এখনও অনেকে পেইন্টিং আর পোস্টারের তফাৎ বোঝে না’

গ্রন্থণা: সুরাইয়া নাজনীন

এদেশে সৃজনশীলতার মূল্যায়ন আছে আবার নেই। আমাকে এখনও পেইন্টিং আর পোস্টার এর তফাৎ বোঝাতে হিমশিম খেতে হয়। অনেকে বলে আপনার সরাগুলো তো মাটির তাইলে এতো দাম কেনো? আমি তাতে বিচলিত হয়ই না, কারণ হাতে আঁকা আর কাগজের পোস্টার কি এক হলো? এভাবেই বলছিলেন লিপিকা সরকার তমা। তিনি একজন নারী উদ্যেক্তা। কিভাবে উদ্যেক্তা হলেন সেই গল্প নিয়েই আয়োজন-

 

আপনার শুরুর গল্পটা বলুন


আঁকিবুঁকি করতে ছোট বেলা থেকেই ভালো লাগতো। স্কুল জীবনে ছবি আঁকা ছিল আমার নেশা। টিচার আর সহপাঠীরা খুবই প্রশংসা করতো। ছোট ছোট অনেক পুরস্কারও পেয়েছি ছবি এঁকে। কিন্তু মাধ্যমিক আর উচ্চমাধ্যমিক শেষে চারুকলায় পড়ার ইচ্ছা থাকলেও আর পড়া হয়ে উঠেনি পরিবারের কথায়। তারপর পড়াশোনা শেষ করছি মার্কেটিং নিয়ে। টিউশন আর জবের জন্য পড়ার পাশাপাশি নিজে কিছু করার ইচ্ছা আমার অনেক দিন ধরেই ছিল। কেন যেন হয়ে উঠছিল না। ২০২০ সাল আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। লকডাউনে ঘরে বসে সময় নষ্ট করতে করতে যেনো হাপিয়ে উঠি। চিন্তা করলাম নিজেই উদ্যোক্তা হবো। আর নিজের একটা পরিচয় বানাবো। এই সময় টা ঘরে বসে নষ্ট করার না নিজেকে ঘুরে দাড়ানোর। অনেক ভাবনার পর ১৫ই আগস্ট ২০২০ শুরু হয় চিত্ররথের যাত্রা।
শুরু করলাম নিজের মনের সেই খোরাক ছবি পেইন্টিং। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই সবার অনেক ভালোবাসা পেয়েছি, পাচ্ছি। এখন আর আফসোস হয় না, যে আমি তো চারুকলা নিয়ে পড়তে চেয়েছিলাম। কারণ আমি এখন আমার মনের ইচ্ছায় ছবি আঁকি। নেমে গেলাম নিজের কাজে স্বপ্ন পূরনের জন্য।

 

আমাদের দেশে সৃজনশীলতার মূল্যায়ন কতটুকু বলে আপনার মনে হয়?


সৃজনশীলতার মূল্যায়ন আছে আবার নেই। বাংলাদেশ এখনো এতোটা উন্নত না যে ক্রিয়েশনের মূল্যায়ন বুঝবে। এদেশে পেইন্টিং আর পোস্টার এর তফাত বুঝাতে হিমশিম খেতে হয়। অনেকে বলে আপু আপনার সরাগুলো তো মাটির তাইলে এতো দাম কেনো? আমি তাতে বিচলিত হয়ই না.. কারণ হাতে আঁকা আর কাগজের পোস্টার কি এক হল? পেইন্টিংয়ে মিশে থাকে আমার শ্রম, সময়, আর আত্মবিশ্বাস। সবাই তো আর খারাপ বলে না কিছু মানুষ তো অনেক প্রশংসাও করে। আমি কাজ করছি মাটির সরা পেইন্টিং নিয়ে। গ্রামবাংলার সেই চিরচেনা মাটির সরা। সরাও পেইন্টিং করে ঘরে সাজিয়ে রাখা যায় এটাই তুলে ধরার প্রচেষ্টা।

 

লিপিকা সরকার তমা

দেশিয় পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা কেমন?


দেশিয় পন্যের গ্রহণযোগ্যতা আগের থেকে অনেক বেড়েছে। এখন মানুষ বিভিন্ন গ্রুপের সাথে জড়িত। আমি উইমেনস অ্যান্ড ই- কমার্স গ্রুপের সদস্য। এ গ্রুপে সব দেশিয় পন্য আর ঐতিহ্য নিয়ে নানারকম আলোচনা করা হয়। ঘরে বসেই যদি হাতের কাছে এত দেশিয় পন্য হাতে পাওয়া যায় তাহলে কেনো মানুষ কিনবে না?

একজন নারী উদ্যেক্তা হিসেবে টিকে থাকার লড়াই সম্পর্কে বলুন।


আমি একজন নারী এটা আমার গর্ব। আমি কখনো নিজেকে ছোট করে দেখিনি। কিন্তু হ্যাঁ অনেক শুনেছি অন্যের মুখ থেকে। আপন মানুষের থেকে শুনেছি অনেক কটু কথা। কিন্তু আমার পরিবার আমাকে আগলে রেখেছে সব বাধা বিপত্তি থেকে। নিজেই নিজের রাস্তা খুঁজে নিয়েছি। সব বাঁধা পেড়িয়ে আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যাবো স্বপ্ন পূরনের জন্য। আমি জানি আমি নারী। আমি চাইলে সব বাধা পেড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাবো।

তরুণদের উদ্যেক্তা হতে হলে কি কি বিষয় গুরুত্ব দিতে হবে?


সবার আগে জানতে হবে কি নিয়ে কাজ করবে। সেই বিষয়ে নিজের দক্ষতা কেমন। বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করতে হবে। তাহলেই সফল উদ্যোক্তা হিসাবে পরিচিত লাভ সম্ভব।

 

ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে গুচ্ছ মেলা কতটা গুরুত্ব রাখে?


ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে মেলা তো খুব ভালো ফলাফল আনতে পারে। আমরা যারা অনলাইন ব্যবসায়ী তাদের জন্য মেলা অন্যরকম হবে। এখানে ক্রেতার সাথে সরাসরি কথপোকথন, তাদের চাহিদা সম্পর্কে জানা যাবে। এতে উদ্যোক্তা ও ক্রেতার মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠবে।

একজন নারী উদ্যেক্তার জন্য পারিবারিক সহযোগিতা কতটুকু প্রয়োজন?


একজন উদ্যোক্তার জন্য পারিবারিক সহযোগিতা অনেক জরুরি। সর্বাঙ্গীন সহযোগিতা যে পাবে সেই এগিয়ে যাবে অনেক দূর। তার জন্য কাজের পরিসর হবে আরও সহজ।

চাকরি এবং ব্যবসা, কোনটি প্রাধান্য পাবে আপনার কাছে?


যে কাজই করা হোক তা যেন নিজের ভালো লাগার জন্য করা হয়। কারো প্রেসার বা লোকে কি বলবে তা ভেবে নয়। যে চাকরি করতে ইচ্ছুক সে চাকরি করবে, আর যে ব্যবসা করতে ইচ্ছুক সে ব্যবসা। মনের প্রশান্তি হলো আমার কাছে বড়।

 

বর্তমানে অনলাইন পণ্যের অভাব নেই, ঠিক কোন বিশেষত্বের কারণে আপনার পণ্যটি গ্রহণযোগ্য হবে।


মনের খোরাক আর প্রশান্তির অনবদ্য ছোঁয়াই আমার পণ্যের বিশেষত্ব। ঘর সাজাতে কার না ভালো লাগে? আর তা যদি হয় দেশিয় পণ্য নিয়ে। পেইন্টিং মনের খোরাক মিটায়.. আর ঘরকে করে আকর্ষনীয়। মাটির সরায় নানা রঙের আল্পনা আর প্রকৃতির সৌন্দর্য ঘরকে দেয় আভিজাত্যের ছোঁয়া।

একজন হারিয়ে যাওয়া কিংবা পিছিয়ে পড়া উদ্যেক্তার জন্য উঠে আসার শক্তি কি হতে পারে?


একজন উদ্যোক্তা হিসেবে যদি কেউ সফল হতে চায় তাহলে তাকে অবশ্যই কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে এবং সেই সাথে তাকে তার দুর্বলতাগুলো কে কাটিয়ে উঠতে হবে। তার সামনে পিছনে যদি দুর্বলতা কাজ করে তাহলে তার জীবনে সফলতা অর্জন করতে পারবেন না। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে তার মধ্যে প্রচন্ড মানসিক চাপ থাকতে পারে কিন্তু সেই মানসিক চাপ তাকে কাটিয়ে উঠতে হবে, তাহলেই সে একজন সফল উদ্যোক্তা হতে পারবে। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে যদি তার মধ্যে ইচ্ছা, ধৈর্য্য এবং ঝুঁকি নেবার সাহস থাকে তাহলে সে পারবে একজন সফল উদ্যোক্তা হতে। আর যদি এর বিপরীত হয়ে থাকেন যেমন তার কোনো ইচ্ছা শক্তি নাই, ধৈর্য্য এবং ঝুঁকি নেবার সাহস নাই তাহলে সে অনেক পিছিয়ে পড়বে আর এ দুর্বলতা গুলো তাকে সফল হতে দিবে না।

 

ধন্যবাদ আপনাকে, পাঠকদের উদ্দেশ্য কিছু বলতে পারেন


পাঠক দের উদ্দেশ্য বলতে চায়, কিছু অযোগ্য মানুষ আপনাকে বিভিন্ন নির্দেশাবলী অনুসরণ করানোর জন্য চেষ্টা করবে যেন আপনি পিছিয়ে পড়েন আপনার লক্ষ্য থেকে। হ্যাঁ, একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার উচিত ওই নির্দেশনাবলী থেকে যা আপনার সঠিক মনে হয় তা গ্রহণ করা আর যা আপনার কাছে খারাপ মনে হয় তা বর্জন করা। যদি আপনি সঠিক সময়ে সঠিক ভাবে সঠিক পথটি অনুসরণ করতে পারেন তাহলেই আপনি সফল হতে পারবেন।

শেয়ার করুন :